পানিবাহিত রোগ | Water borne diseases

 পানিবাহিত রোগ | Water borne diseases

পানিবাহিত রোগ
পানিবাহিত রোগ



পানিবাহিত রোগ হলো এমন সব রোগ যা দূষিত পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনিরাপদ পানি পান করা, দূষিত পানিতে গোসল করা বা খাবার তৈরিতে দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে এই রোগগুলো সংক্রামিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

দূষিত পানি পান করার মাধ্যমে অথবা সেই পানি রান্নাসহ ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করার ফলে যে ধরনের রোগ সংক্রমিত হয় তাকেই পানিবাহিত রোগ বা জলবাহিত রোগ বলা হয় । দূষিত পানিতে জীবাণু, ভাইরাস, পরজীবী এবং রাসায়নিক পদার্থ থাকতে পারে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পানিবাহিত রোগ বিশ্বব্যাপী একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে। অতি পরিচিত পাঁচটি পানিবাহিত রোগ হল ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা, জন্ডিস ও টাইফয়েড। বন্যার পর ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায় । যে সব অনুজীব রোগ সৃষ্টি করে তাদেরকে প্যাথজেনিক বলে ।

ডায়রিয়ার প্রতিকার

⮚ ডায়রিয়া চিকিৎসার মূল নীতি:


পানি স্বল্পতা প্রতিরোধ করা ;

পানি স্বল্পতার সৃষ্টি হলে তা পূরণ করা ;

ডায়রিয়া চলাকালে ও পরবর্তীকালে শরীরের উপযুক্ত পুষ্টির ব্যবস্থা করা ;

⮚ পানি স্বল্পতা প্রতিরোধ করার জন্য :


ক. রোগীকে অতিরিক্ত পানীয় (যেমন- ভাতের মাড়, লবণ গুড়ের শরবত, মুখে খাওয়ার স্যালাইন ইত্যাদি) পান করাতে হবে;

খ. রোগীকে যথেষ্ট খাবার দিতে হবে;

⮚ পানি স্বল্পতা সৃষ্টি হলে :


ক. শরীর থেকে যে পানি ও লবণ বের হয়ে গিয়েছে তা পূরণ করতে হবে। পানি স্বল্পতার মাত্রানুসারে মুখে খাবার স্যালাইন কিংবা শিরায় স্যালাইন দিয়ে পানি স্বল্পতা পূরণ করা যায়।

খ. ডায়রিয়া চলতে থাকলে মুখে খাওয়ার স্যালাইন খাইয়ে পানি স্বল্পতা রোধ করতে হবে।

⮚ ডায়রিয়া রোগীকে স্যালাইন খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় কেন:


ডায়রিয়ার মূল সমস্যা হল দেহ হতে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। এতে পানি শূন্যতা দেখা দেয়। এ জন্য ডায়রিয়া রোগীকে ওর-স্যালাইন (ORS) খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।


⮚ ওর স্যালাইনের (ORS) উপাদান:

১.৩০ মিঃ গ্রাম - সোডিয়াম ক্লোরাইড

০.৭৫ মিঃ গ্রাম - পটাশিয়াম ক্লোরাইড

১.৪৫ মিঃ গ্রাম - ট্রাই সোডিয়াম সাইট্রেট

৬.৭৫ গ্রাম - গ্লুকোজ


⮚ ডায়রিয়ায় ডাবের পানি উত্তম কেন:


ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর ঘনঘন পাতলা পায়খানা ও বমির ফলে শরীরের প্রয়োজনীয় পানি ও অত্যাবশ্যকীয় খনিজ লবণের অভাব দেখা দেয়। ডাবের পানিতে পটশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং কিছুটা গ্লকোজও থাকে। এসব রাসায়নিক পদার্থের সাথে কিছুটা সোডিয়ামও বিদ্যমান। অন্য কোনো পানীয়তে এত সব নেই। এজন্য ডায়রিয়া হলে ডাবের পানি অত্যন্ত উপকারী।


⮚ নরমান স্যালাইন: সোডিয়াম ক্লোরোইডের ০.৯% জলীয় দ্রবণ।


⮚ খাবার স্যালাইন: icddr'b (International Centre for Diarrhoreal Disease Research, Bangladesh) ১৯৬০ সালে ওরস্যালাইন বা খাবার স্যালাইন আবিষ্কার করেন ।


⮚ খাবার স্যালাইন বানানোর পর কতক্ষণ পর্যন্ত খাওয়ানো যাবে : ওআরএস প্যাকেট দিয়ে তৈরি স্যালাইন ১২ ঘন্টা পর্যন্ত ভালো থাকে। যদি ১২ ঘন্টা পর স্যালাইন অবশিষ্ট থাকে তবে তা ফেলে দিতে হবে এবং পুনরায় নতুন স্যালাইন তৈরি করতে হবে।


আমাশয়ের কারণ এবং প্রতিকার

অ্যান্টি অ্যামিবা হিস্টোলাইটিকা নামক এক প্রকার প্রোটোজোয়া এবং সিগেলা নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এ রোগ হয়। আমাশয় দুই ধরনের- অ্যামেবিক আমাশয় ও ব্যাসিলারি আমাশয়। মবিকুইন এন্টারোভায়োফর্ম ও Metronidazole অ্যামেবিক আমাশয়ের জন্য এবং মালফাগুয়ানিডিন, স্ট্রেপটোমাইসিন প্রভৃতি ব্যাসিলারি আমাশয়ের প্রতিকারের জন্য ব্যবহৃত হয়।


আমাশয়ের উপসর্গ এবং প্রতিকার: Antamoeba histolytica নামক এক প্রকার প্রোটোজোয়া এবং Shigella নামক এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে এ রোগ হয়। তাই আমাশয় দু'ধরনের অ্যামেবিক আমাশয় ও ব্যাসিলারী আমাশয়। নাভির চারপাশে ব্যথা, ঘন ঘন মলত্যাগ, মলের সাথে পুঁজ, শ্লেষ্মা ও রক্তক্ষরণ এ রোগের লক্ষণ। অ্যামেবিক আমাশয়ের লক্ষণ হলো দুর্গন্ধযুক্ত তরল মল, বাদামী রঙের স্বল্প শ্লেষ্মাযুক্ত মল।


কলেরা রোগের কারণ ও প্রতিকার

সাধারণত দূষিত খাবার গ্রহণের সময় মানুষ কলেরার জীবাণু গ্রহণ করে। মাছি এ রোগ বেশি ছড়ায়। টেট্রা সাইক্লিন এবং ওরাল ফ্লুইড গ্রহণ করলে এ রোগ প্রতিকার করা যায়। এ রোগ প্রতিরোধ করতে হলে কলেরা প্রতিরোধক টিকা নেয়া প্রয়োজন। আক্রান্ত রোগীকে আলাদা করে রাখতে হবে। রোগীর মলমূত্র মাটিতে পুতে রাখতে হবে ও পানি ফুটিয়ে খেতে হবে।


কলেরা স্যালাইন কে আবিষ্কার করে : ICDDR,B

ICDDR,B এর পূর্ণরূপ : International Center for Diarrhoeal Disease Research, Bangladesh

ICDDR,B কোথায় অবস্থিত : মহাখালী, ঢাকা।

টাইফয়েড : বেসিলাস টাইফাস নামক জীবাণু দ্বারা এ রোগের উৎপত্তি। এ ধরনের জীবাণু পানি, খাদ্য বা দুধের সাথে শরীরে প্রবেশ করে এবং রক্তে বিষ ছড়ায়। টাইফয়েড প্রতিরোধক টিকা নিলে ও পানি ফুটিয়ে খেলে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।






১. প্রধান পানিবাহিত রোগসমূহ


রোগের নাম


জীবাণুর ধরন


প্রধান লক্ষণসমূহ


ডায়রিয়া


ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়া


ঘন ঘন পাতলা পায়খানা, শরীর দুর্বল হওয়া, বমি বমি ভাব।


কলেরা


ব্যাকটেরিয়া (Vibrio cholerae)


চাল ধোয়া পানির মতো পাতলা পায়খানা, তীব্র বমি, দ্রুত পানিশূন্যতা।


টাইফয়েড


ব্যাকটেরিয়া (Salmonella typhi)


দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া, ক্ষুধামন্দা।


জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই)


ভাইরাস


চোখ ও প্রস্রাব হলুদ হওয়া, লিভারে ব্যথা, ক্লান্তি ও বমি।


আমাশয়


ব্যাকটেরিয়া/পরজীবী


মলের সাথে রক্ত বা শ্লেষ্মা (মিউকাস) যাওয়া, পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা।


পোলিও


ভাইরাস


মাংসপেশির দুর্বলতা, জ্বর এবং গুরুতর ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস।


২. রোগের প্রধান কারণসমূহ


মলমূত্র দ্বারা পানি দূষণ: খোলা ল্যাট্রিন বা নর্দমার ময়লা জলাশয়ের পানির সাথে মিশলে।


অনিরাপদ উৎস: নদী, পুকুর বা কুয়োর অপরিশোধিত পানি সরাসরি পান করা।


ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব: টয়লেট ব্যবহারের পর বা খাবার আগে হাত ভালো করে সাবান দিয়ে না ধোয়া।


বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বন্যার সময় সুপেয় পানির উৎসগুলো ময়লা ও জীবাণুর সাথে মিশে দূষিত হয়ে যায়।


শিল্প বর্জ্য: কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য পানির উৎসে মিশলে পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ে।


৩. সাধারণ লক্ষণসমূহ


রোগভেদে লক্ষণ আলাদা হলেও কিছু সাধারণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে:


পেটে ব্যথা ও মোচড় দেওয়া।


বমি বমি ভাব বা বারবার বমি হওয়া।


জ্বর ও প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা।


পানিশূন্যতা (জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া)।


৪. পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধের উপায়


১. নিরাপদ পানি পান: পানি অন্তত ২০ মিনিট ফুটিয়ে পান করা উচিত। ফুটানো সম্ভব না হলে ফিল্টার বা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট (হ্যালোজেন ট্যাবলেট) ব্যবহার করতে হবে।

২. হাত ধোয়ার অভ্যাস: খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে।

৩. খাদ্য নিরাপত্তা: শাকসবজি ও ফলমূল ধোয়ার জন্য পরিষ্কার পানি ব্যবহার করা এবং খাবার সবসময় ঢেকে রাখা।

৪. স্যানিটেশন: খোলা জায়গায় মলত্যাগ বন্ধ করা এবং স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার নিশ্চিত করা।

৫. টিকাদান: টাইফয়েড, পোলিও, কলেরা এবং হেপাটাইটিস-এর জন্য প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ করা।

৬. সচেতনতা: পানির ট্যাংকি বা আধার নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং রাস্তার ধারের খোলা খাবার বা পানীয় এড়িয়ে চলা।


৫. প্রাথমিক চিকিৎসা


আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়, তাই প্রধান চিকিৎসা হলো রিহাইড্রেশন:


প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার স্যালাইন (ORS) পান করতে হবে।


বাড়িতে তৈরি লবন-গুড়ের শরবত, ভাতের মাড় বা ডাবের পানি দেওয়া যেতে পারে।


শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধ বা স্বাভাবিক খাবার বন্ধ করা যাবে না।


যদি রোগীর অবস্থা খুব খারাপ হয় (যেমন: চোখ বসে যাওয়া, প্রস্রাব বন্ধ হওয়া বা অতিরিক্ত বমি), তবে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে।


সতর্কতা: এই তথ্যগুলো সাধারণ সচেতনতার জন্য। যেকোনো শারীরিক সমস্যায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Next Post Previous Post

আরো পড়ুন এখানে